তামাক চাষের কুফল ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা অর্থনীতি

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। নানা কারণে আবাদি জমি আশঙ্কাজনকভাবে ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্বের বিপন্নতা বাড়ছে। যেখানে খাদ্যশস্যের জমিতে তামাক চাষ নিশ্চিতভাবেই অশনিসংকেত ছাড়া কিছু নয়। তামাক একটি আগ্রাসী ফসল, যেটি পরীক্ষিতভাবে সত্য। তামাক অর্থকরী ফসল হিসেবে যদিও দাবি করা হয়, আসলে লাভের অংশ একটু সচেতনভাবে হিসাব করলে দেখা যায় খাদ্যশস্য উৎপাদন তামাক চাষের চেয়েও আরো অনেক বেশি লাভজনক। যেমন তামাক চাষ করলে অন্য ফসল উৎপাদন করে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। খাদ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য কোটি কোটি টাকার আমদানির ওপর নির্ভর হয়ে পড়ছে দেশ। যেটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শস্য বৈচিত্র্যের ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পের কাঁচামাল সংকট দেখা দিচ্ছে, যার পরিণতি বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, নিজস্ব শিল্প-কারখানার ভঙ্গুর অবস্থা। তামাক চাষের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন শুধু নির্দিষ্ট কোনো দেশ নয়, এটি সারা বিশ্বের পরিবেশ, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সময়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তামাক চাষের জমিতে অন্য ফসল সময়মতো চাষ করা যায় না। তামাক চাষের জন্য অধিক উর্বর জমি দরকার হয়। রবিশস্যের জন্য আর সেই উর্বর জমি থাকে না। শেষ পর্যন্ত ফসলি জমির উর্বরা শক্তি ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে প্রান্তিকে চলে যায়।

যেসব জমিতে আগে চাষ হতো ধান, গম, পেঁয়াজ, রসুন, আলু, পটোল, সরিষা, পাট ইত্যাদি ফসল ও সবজি, সেখানে চাষ হচ্ছে প্রকৃতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতিকর তামাক। যেটি কোনো খাদ্যফসল নয়, কোনো প্রয়োজনীয় শিল্পের কাঁচামালও নয়।

যেকোনো ধরনের তামাকই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তামাকের ক্ষতির বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পায় না লাভপ্রত্যাশী উৎপাদনকারী কৃষক, আগামী সম্ভাবনাময় শিশু, আবালবৃদ্ধবনিতা তথা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্ব। অনেক ধনী দেশ তামাক চাষে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তারা তাদের সচেতনতা ও দেশপ্রেমের মানসিকতা থেকে সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফল হিসেবে দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তামাক চাষ বন্ধ করেছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশ তথা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা তামাকের ক্ষতির ব্যাপারে এখনো উদাসীন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় তামাক চাষ হয়। তার মধ্যে রয়েছে রংপুর, লালমনিরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, বান্দরবান, কক্সবাজার ইত্যাদি অঞ্চল।

নদীবিধৌত ভাটির দেশ বাংলাদেশ। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা আমাদের এ বসুন্ধরা। এ দেশে ফুল-ফল-ফসল অতিসহজেই জন্মে। বিধাতার শ্রেষ্ঠ দান বাংলার এ উর্বর ভূমি জগদ্বিখ্যাত। এ দেশের প্রতি আকর্ষণ ছিল আজকের অনেক ধনী দেশের মানুষের। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি।’

কিছু অসাধু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তে দেশ ও দশের কথা ভুলে গিয়ে, ভবিষ্যতের সুন্দর আগামী চিন্তা থেকে দূরে সরে গিয়ে খেয়াল-খুশিমতো পরিবেশ-প্রতিবেশ, জনস্বাস্থ্য হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, জাতীয় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, সুস্থ-সবল মেধাবী জাতি, নেশামুক্ত সুন্দর উন্নত মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই অন্তরায়। যেটি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের উন্নত রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চিত হুমকি ছাড়া কিছু নয়।

পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা জেনেও বেশি মুনাফা লাভের আশায় সহজ-সরল সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষী তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছেন টোব্যাকো কোম্পানির নানা প্রলোভনে। কৃষকদের বেশি মুনাফার ফাঁদে ফেলে কোম্পানি বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করছে। যেখানে অন্য খাদ্যফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এমন সুযোগ-সুবিধাসহ সহজ শর্তে ঋণ প্রদান দেখা যায় না। অগ্রিম অর্থসহ নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার মধ্য দিয়ে তাদের দিয়ে কৌশলে তামাক চাষ করাচ্ছে মুনাফালোভী কারবারি।

দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষ করার কারণে জমির উর্বরা শক্তি দিন দিন কমতে থাকে। একই জমিতে টানা কয়েক বছর তামাক চাষের কারণে জন্মাচ্ছে ক্ষতিকর এক ধরনের আগাছা, যেটি ক্লোরোফিলবিহীন। এটি জমির উর্বরা শক্তি, পানি ধারণক্ষমতা, মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে, একটা পর্যায়ে এসব জমিতে অন্য কোনো ফসল হয় না। টোব্যাকো কোম্পানি তামাক চাষের জন্য এক জেলা থেকে অন্য জেলায় স্থানান্তর হয়। উর্বর জমি ব্যবহার শেষ হলে অন্য জেলায় তাদের কৌশলগত বিষয়টি প্রয়োগ করে পুনরায় চাষ শুরু করে।

আবার আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামনের দিনগুলোয় পৃথিবীকে মোকাবেলা করতে হবে মারাত্মক কিছু সমস্যা; যেমন তীব্র দাবদাহ, বন্যা, খরা, ভূমিক্ষয়, মাটির উর্বরা শক্তি হ্রাস, বিভিন্ন সংক্রামক-অসংক্রামক রোগবালাই, খাদ্য সংকট, মেরুতে বরফ গলা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি। মনুষ্যসৃষ্ট অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিনিয়ত প্রকৃতি পাল্টা জবাব দিচ্ছে। কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন, মিথেন, কার্বন মনোঅক্সাইড ইত্যাদি বেড়েই চলেছে, যার দরুন উৎপাদিত শস্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে আর গুণগত পুষ্টিমান হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে ফসলের পুষ্টি উপাদান যেমন জিংক, আয়রন, কপার, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শেষাবধি মানবদেহের ওপর। পরিণতি হচ্ছে রুগ্ণ-শুকনা, মেধাহীন, দুর্বল চিত্তের অসুস্থ জাতি। এর খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো দেশ তথা বিশ্বকে। সুস্থ দেহ, সুস্থ মন, কর্মব্যস্ত, সুখী-সমৃদ্ধ জীবন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পুরো পৃথিবী।

আবার হিসাব করলে দেখা যায়, তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে অনেক জ্বালানির প্রয়োজন পড়ে। তামাক পোড়ানোর এলাকা দূষিত হওয়ার কারণে তীব্র শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালাপোড়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া, ফুসফুসে সমস্যা, হাঁচি, কাশি ইত্যাদি স্বাস্থ্যগত সমস্যায় পড়তে হয়। প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠের জন্য উজাড় হচ্ছে প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধু পরিবেশ সুরক্ষাকারী বৃক্ষ। যেখানে একটি দেশের আয়তনের প্রায় ২৫ শতাংশ বন থাকা খুব জরুরি, সেখানে বন তথা বৃক্ষ পোড়ানো পরিবেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

তামাক চাষের জন্য মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োজন পড়ে। জানা যায়, তামাকের জমিতে অন্য ফসলের চেয়ে বেশি সার-বিষ প্রয়োগ করতে হয়। ফলে মাটি, পানি, বায়ু দূষিত হয় নানা উপায়ে। অধিক মাত্রায় এগুলো প্রয়োগের ফলে প্রয়োগকৃত সার, বিষ গড়িয়ে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা-বিলঝিলে গিয়ে পড়ে। তাতে প্রাকৃতিক জলজ প্রাণী ও জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, কেঁচো, সাপ, মৌমাছি, গরু-ছাগল ও পরিবেশের জন্য উপকারী প্রাণিকুল তথা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। যে কারণে নানা সময় নানাভাবে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিয়ে থাকে আমাদের ওপর।

তামাকচাষীর তামাকের জমিতে সার, কীটনাশক ব্যবহারকালীন যথাযথ স্বাস্থ্য নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কৃষকসহ পরিবারের সবাই। তামাকের নিকোটিন ভেজা অবস্থায় হাতের স্পর্শে এলে অথবা শরীরে লাগলে, রোমকূপের মাধ্যমে চামড়ায় প্রবেশ করলে হাতের চামড়া কালো হয়ে যাওয়াসহ নানা ধরনের চর্মরোগ ও পেটের পীড়া দেখা দেয়। এছাড়া নারীদের সন্তান নষ্ট হওয়া, যৌনক্ষমতা হ্রাস, বিকলাঙ্গ সন্তান প্রসব, শিশুর অকালে মৃত্যু ইত্যাদি হতে পারে। তামাকজাত দ্রব্য থেকে উৎপাদিত সিগারেট, জর্দা, গুল, চুরুট, সাদাপাতা ইত্যাদি ব্যবহারের কারণে উচ্চরক্তচাপ, মানসিক বিকারগ্রস্ততা, দন্তক্ষয়, ক্ষুধামান্দ্য, মুখে লালা ঝরা, মাথাব্যথা, চুলকানি, আলসার, মুখে ঘা, শরীরে ক্ষত সৃষ্টি, স্মৃতিশক্তি লোপ, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি অসংক্রামক রোগ হয়।

তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারজনিত কারণে সারা বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে একজন লোকের ক্যান্সার, হূদরোগ, হাঁপানি, ফুসফুস ক্যান্সার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ইত্যাদি প্রাণঘাতী রোগ হয়ে থাকে। প্রাথমিকভাবে বিড়ি-সিগারেটের নেশা থেকে অনেকে মদ, গাঁজা, আফিম, হেরোইনে আসক্ত হয় এবং বড় ধরনের অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। নেশাজাতীয় দ্রব্য পাচার ও ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ব্যক্তি পরিবার, সমাজ তথা দেশের জন্য অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

তামাক নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক প্রকাশনা দ্য টোব্যাকো এটলাসের ২০১৮ সালের সংস্করণে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ১ লাখ ৬২ হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে। গবেষণায় আরো দেখা যায়, সরকার সব ধরনের তামাক থেকে যত রাজস্ব পায়, তার প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হয়। দেশের জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ তামাকের কারণে অপচয় হয়।

তাই খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, শিক্ষা, কৃষি অর্থনীতি, গৃহস্থালি, জলবায়ু, আবহাওয়া, মাটি, পানি, মানবস্বাস্থ্য উন্নয়ন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা তথা টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে তামাক চাষ বন্ধ করা জরুরি।

লেখক: মোশারফ হোসেন

শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগসরকারি ইস্পাহানি কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা