আ‌মে‌রিকার ডলার কেন্দ্রীক সাম্রাজ্যবাদ ঠেকা‌তে আমা‌দের করণীয় মতামত

এক. কিছুদিন পূর্বে তুরস্কের উপর আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধ এবং অবরোধের ফলে তুরস্কের মুদ্রা লিরার ভ্যালু কমে যাওয়া আমাদেরকে ডলারের বিষয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে বিভিন্ন দেশকে আক্রমন করে কথা বলছে এবং পণ্য আমদানিতে যেভাবে শুল্ক বাড়ানোসহ বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক অবরোধ দেয়া শুরু করেছে অদূর ভবিষ্যতে কখনও বাংলাদেশও যে এমন পরিস্থিতির শিকার হবে না সেটা একশভাগ নিশ্চিত করে বলা যায় না।এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাধ্যম হিসেবে শুধু ডলার না রেখে স্বর্ণমুদ্রাও রাখা। এতে লাভ হবে ৪টা-১. আমেরিকান ডলারের উপর নির্ভরতা কমবে,২. স্বর্ণের বাজার মূল্য ডলারের চেয়ে অনেক বেশি ক্রমবর্ধমান উর্দ্ধোমুখী হওয়ায় ইয়ার বাই ইয়ার মজুদের পরিমাণ বাড়বে।  যেমন- গত ৪ দশকে স্বর্ণের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৩২ গুণ। আর ডলারের দাম বেড়েছে ১০ গুণ মাত্র। যেমন- ১৯৭০ সালে প্রতি ভরি গিনি স্বর্ণের দাম ছিল ১৫০ টাকা। দশ বছরের ব্যবধানে ১৯৮০ সালে দাম হয় ৩ হাজার ৫০ টাকা। যেখানে বৃদ্ধির হার ২১৩ শতাংশ। আর বর্তমানে স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি ৪০-৫০ হাজার।১৯৮০ সাল থেকে ধরলে বর্তমান সময় পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ১৫ গুণ বেড়েছে। অপরদিকে, ১৯৮০ সালে প্রতি ডলারের মূল্য ছিল ৩০ টাকা প্রায়। অথাৎ ১৯৮০ সাল থেকে ধরলে বর্তমান সময় পর্যন্ত ডলারের দাম বেড়েছে ২.৫ (আড়াই গুণ) গুণ মাত্র। তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে, রিজার্ভ হিসেবে স্বর্ণমুদ্রা মজুদ করলে লাভ কয়েক গুণ বেশি।৩. স্বনির্ভরতা বাড়বে, এবং৪. রিজার্ভ হিসেবে স্বর্ণ মজুদ থাকায় কখনও ডলারের পতন হলেও আমাদের রিজার্ভের কোনো সমস্যা হবে না, বরং উদ্ধোমুখী-ই থাকবে।

দুই. তুরস্কের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক তিক্ত হওয়ায় আমেরিকা তুরস্কর উপর অর্থনৈতিক অবরোধ করেছে। এর ফলে তুরস্কের মুদ্রা লিরা’র ভ্যালু অনেক কমে গেছে। তুরস্কের ইকোনোমির জন্য এই অবরোধ বড় একটা ধাক্কা বা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।বাংলাদেশ সরকারের সাথে আপাতত আমেরিকার সম্পর্ক অতটা ভাল যাচ্ছে না। যদি কোনো কারণে সম্পর্ক আরো বেশি তিক্ত হতে থাকে, তাহলে আমেরিকা যদি তুরস্কের মত বাংলাদেশের উপরও অর্থনৈতিক অবরোধ করে বসে তখন কী হবে! তখন আমাদের ইকোনোমির অবস্থাও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে অর্থাৎ বড় একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের।

তিন. বর্তমানে বাংলাদেশে বৈদিশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩১.৯০ বিলিয়ন (৩ হাজার ১৯০ কোটি ডলার) মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, তাতে ৯ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। (দৈনিক ইত্তেফাক- ১২ জানুয়ারি, ২০১৮)সুতরাং বর্তমানে বাংলাদেশে মজুদ থাকা ৩ হাজার কোটি ডলারের মধ্যে ১ হাজার কোটি ডলারে রেখে বাকি ২ হাজার কোটি ডলার ডলারে না রেখে স্বর্ণ রাখা উচিত। তাহলে আমাদের মজুদ করা রিজার্ভ শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকবে।

চার. কোনো এক সময় স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রাই ছিল পণ্যের বিনিময় মূল্য। এসব মুদ্রা ব্যবহারের সুবিধা হল এসব ধাতুর নিজস্ব একটা বাজার মূল্য আছে, প্রিন্টেট টাকার মতন এটা ইচ্ছেমত প্রিন্ট করে বাজারে ছাড়া যায় না বরং খনি থেকে তুলে বাজারে ছাড়তে হয়। সময়ের পরিক্রমায় সেই  মুদ্রাই আজ প্রিন্টেড কাগজ (টাকা/ডলার ইত্যাদি)। এই কাগজ বা টাকা এখন পণ্য কেনা বেচার বিনিময় মূল্য হিসেবে চলছে। কারণ, স্বর্ণ, রৌপ্য মুদ্রা বহন করা কষ্টসাধ্য হওয়ায় তখন নিয়ম করা হল যে, স্বর্ণমুদ্রাকে ব্যাংকে জমা রেখে স্বর্ণমুদ্রার ইক্যুইভ্যালেন্ট (সমমানের কিছু) ‘প্রিন্ট করা টাকা’ বাজারে ছাড়া যাবে। আবার যদি কেউ তার স্বর্ণ ব্যাংক থেকে তুলতে চায় তাহলে তাকে ব্যাংকের ইস্যুকৃত প্রিন্ট করা টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে তুলতে হবে। অথাৎ তখন ‘প্রিন্ট করা টাকা-ই’ ছিল স্বর্ণের রিসিট কপি।৭০ এর দশকের পর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের চাহিদা বাড়তে থাকায় আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে ডলার ছাপাতে থাকে। কিন্তু আজ আমেরিকা স্বর্ণমুদ্রার মজুদ ছাড়াই ডলার ছাপাতে পারে। এর জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতি ওহাবী নিয়ন্ত্রিত সৌদি আরবের সমর্থনটাই মূল ভূমিকা রেখেছিল।১৯৭৩ সালে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ ফয়সালের সঙ্গে আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার চুক্তি করে যে, ‘একমাত্র আমেরিকান ডলারেই সৌদি আরব তার তেলসম্পদ বিক্রি করবে।’ বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি রাজতন্ত্রের শত্রুপক্ষের হাত থেকে সৌদী বাদশাহ ও তাদের রাজতন্ত্রকে নিরাপত্তা দিবে।সৌদি আরব সুযোগ বুঝে তেল রপ্তানিকারক সংগঠন ঙচঊঈ ভুক্ত দেশগুলোকেও এই চুক্তির আওতায় নিয়ে আসে। তেল আন্তর্জাতিক বৃহত্তম বাণিজ্য পণ্য হওয়ায় এই চুক্তি আমেরিকান ডলারের কৃত্রিম চাহিদা  তৈরি করে এবং আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে অগণিত নোট ইস্যু করার সক্ষমতা দান করে। এতোদিন তাদের ডলারের বিপরীতে সমপরিমাণ স্বর্ণ রিজার্ভ রাখা বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু এখন আর তার প্রয়োজন নেই। ফলে তেল এখন স্বর্ণের ভূমিকা পালন করছে। এজন্য পেট্রলিয়ামকে কালো সোনা বা ইষধপশ এড়ষফ বলা হয়।

পাঁচ. আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ-এর হিসাব মতে, বিশ্বের মোট রিজার্ভের প্রায় ৬২ শতাংশই সংরক্ষিত আছে ডলারে। বাকি অংশের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ আছে ইউরোতে এবং ইয়েন ও ব্রিটিশ পাউন্ডে সংরক্ষিত আছে ৫ শতাংশ রিজার্ভ। বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের ৮৫ শতাংশই হয়ে থাকে ডলারে।পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো যদি স্বর্ণ বা ডলার মজুদ ছাড়া কারেন্সি তৈরি করতে চায় তাহলে মূদ্রাস্ফীতি হবে, অর্থাৎ পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। কিন্তু সৌদির সাথে আমেরিকার ওই  চুক্তির পর আমেরিকা স্বর্ণ মজুদ ছাড়া ডলার তৈরি করলে মূদ্রাস্ফীতি হয় না। এর বড় কারণ পেট্রোডলার অথাৎ ১৯৭৩ এর সৌদী-আমেরিকার ওই চুক্তি।

ছয়. বিশ্বব্যাপী আমেরিকার আধিপত্য বা সাম্রাজ্যবাদটা মার্কিন ডলার নির্ভর হয়ে আছে। যদি কোনো কারণে ডলারের পতন হয়ে যায় তাহলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরও পতন হয়ে যাবে। আর এর জন্য বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানীকারক দেশগুলোর সংগঠন ‘ওপেক’ যদি তাদের তেল ডলারে বিক্রি বন্ধ করে দেয় তাহলেই ডলারের পতন অথাৎ আমেরিকার পতন শুরু হয়ে যাবে। কারণ বর্তমান বিশ্বে তেল উৎপাদনের শতকরা ৪৪ ভাগ উৎপাদন করে ওপেকভুক্ত দেশগুলো। আর বিশ্বে জ্বালানি তেলের যে মজুদ রয়েছে তার ৭৩ ভাগ রয়েছে এ অঞ্চলে। আমেরিকা যে বর্তমানে তুরস্ক এবং ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ করেছে, এর প্রতিবাদস্বরূপ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সংগঠন ‘ওআইসি’র উচিত- ক্রয়-বিক্রয়ে ডলারকে বর্জন করে নিজস্ব কোনো মুদ্রার মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করা এবং সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করা। এর মাধ্যমেই আমেরিকাকে উচিত জবাব দেয়া হবে এবং আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের পতন শুরু হয়ে যাবে।সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা কর্তৃক বিভিন্ন রাষ্ট্রের উপর আক্রমণাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে বিভিন্ন দেশ নিজস্ব মুদ্রায় বা অন্য কোনো মুদ্রায় বাণিজ্য করার চেষ্টা করছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ডলারের চাহিদা একদিন কমে যাবে। অন্য কোনো মুদ্রা স্থান করে নিবে ডলারের। কিন্তু স্বর্ণের মূল্য কমার সম্ভাবনা নেই। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, মুদ্রার মূল্যের উত্থান পতন হয় কিন্তু স্বর্ণের মূল্যের পতন হয় না, বরং বাড়ে। উপরে এর একটা পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে।সূতরাং বলা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলার বাংলাদেশের জন্য অতটা নিরাপদ নয়। তাই এখন থেকেই বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে, এবং ডলারের পরিবর্তে স্বর্ণের মজুদ বাড়াতে হবে। যাতে করে আমেরিকার থেকে যদি ভবিষ্যতে কখনও কোনো অর্থনৈতিক অবরোধ আসে কিংবা কখনও ডলারের পতন হয় তবে যেন বাংলাদেশের অর্থনীতির কোনো ক্ষতি না হয়; বরং শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি ওআইসির সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো যে, সকল মুসলমান দেশগুলো যেন ডলার বর্জন করে নিজস্ব কোনো মুদ্রায় লেনদেন শুরু করে এবং মুসলিম বিশ্বের নিজস্ব এই মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা মানদ- হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করে। (চলবে)

লেখক: মুহম্মদ জিয়াউল হক আখন্দফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট ও সমাজকর্মী